Mujib 100

মুজিববর্ষ হলো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালনের জন্য ঘোষিত বর্ষ। বাংলাদেশ সরকার ২০২০-২১ সালকে (১৭ই মার্চ ২০২০ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত) মুজিববর্ষ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়।

পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে ঘোষিত মুজিব বর্ষের সময়কাল আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মহামারী করোনার কারণে মুজিব বর্ষের ঘোষিত কর্মসূচি শেষ করতে না পারায় এর সময়সীমা বাড়ানো হয়োছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী / মুজিব বর্ষ রচনা

ভূমিকা:

বাঙালির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের জাতির পিতা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। অনন্যসাধারণ জীবনাদর্শ, দৃঢ ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁর অবদান তাঁকে ইতিহাসে চিরভাস্বর করে রেখেছে। বাঙালির কাছে তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাস:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গােপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। ছয় ভাই-বােনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কেটেছে নিজ গ্রামের গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীকালে তিনি গােপালগঞ্জ মশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক চক্র ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করে। বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সবাইকে সাথে নিয়ে অসহযােগ আন্দোলন গড়ে তােলেন। তার আহ্বানেই বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে প্রয়াসী হন। কিন্তু তার সােনার বাংলা গঠনের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সামরিক বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এসময় তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। সদ্য স্বাধীন জাতির জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি নিয়ে আসে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড।

বঙ্গবন্ধুর অবদান:

বাঙালির অধিকার আদায়ে বঙ্গবন্ধুর অবদান অপরিসীম। তিনি পাকিস্তানি শাসক চক্রের দীর্ঘ তেইশ বছরের অত্যাচার-জুলুমের নাগপাশ থেকে বাঙালিকে মুক্ত করেন। অপরিসীম ত্যাগ ও দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে এনে দেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় স্বার্থকে বড়াে করে দেখেছেন সবসময়। এর জন্যে তাকে অসংখ্যবার কারাবরণ করতে হয়েছে। একের পর এক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলেছে। তবু তিনি দমে যাননি, অন্যায়ের সাথে করেননি আপস বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্রের শােষণ, নিপীড়ন আর বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এই ছয় দফার পক্ষে সারা দেশে ব্যাপক গণজাগরণ তৈরি হয়। এ আন্দোলন নস্যাৎ করতে পাকিস্তানি শাসকরা মামলা দায়ের করে এবং বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সারা বাংলায় চলে অসহযােগ আন্দোলন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক সুবিশাল। জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ২৫-এ মার্চ মধ্যরাত শেষে, অর্থাৎ ২৬-এ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। এ ঘােষণার পরেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় পুরাে সময়টা বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি। কিন্তু তার। সম্মােহনী নেতৃত্ব মানুষের ঐক্য, শক্তি ও প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলেই আমরা পাই স্বাধীনতা

স্বাধীন বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু:

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পরিচালনার ভার নেন। তার নেতৃত্বে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ-এ চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছিলেন। মুক্তিযােদ্ধাদের কল্যাণের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মুক্তিযােদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা তাঁরই অবদান। বঙ্গবন্ধুই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করে বিশ্বসভায় বাংলাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধুর চোখে ছিল সুখী, সমৃদ্ধ, সােনার বাংলাদেশ গড়ে তােলার স্বপ্ন ।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও বাংলাদেশ:

জাতি ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। ২০২১ সালের ২৬শে মার্চ পালিত হবে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। মার্চ ২০২০ হতে মার্চ ২০২১ সময়টিকে মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘােষণা করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বছরব্যাপী বিভিন্ন মধ্য দিয়ে সরকার এ সময়টিকে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমস্ত আয়ােজনের মূল লক্ষ্য হবে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করা।

জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর গুরুত্ব:

বাঙালির জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর গুরুত্ব অপরিসীম। বাঙালি জাতির ইতিহাসে মহানায়কের আসন অলংকৃত করে আছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি আমরা। অপশক্তির শাসন ও শােষণ থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তাই এই মহান মানুষটির জন্মের একশ বছর পূর্তি বাঙালির কাছে এক অনাবিল আনন্দের উপলক্ষ্য। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে ঘিরে যে সকল অনুষ্ঠান আয়ােজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেখানে বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। তবে তরুণরাই হবে সকল আয়ােজনের প্রাণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তাতে বঙ্গবন্ধুর অবদান সম্পর্কে তারা আরাে গভীরভাবে জানতে পারবে এই আয়ােজনের সাথে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন আমাদের জাতীয়তাবােধকে সুদৃঢ় করবে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচি:

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ও জাকজমকের সাথে পালিত হবে। সমস্ত আয়ােজন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১০২ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অপরটি হবে ৬১ সদস্যবিশিষ্ট যা বাস্তবায়ন কমিটি নামে কাজ করবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনে প্রয়ােজনীয় নীতি পরিকল্পনা ও কর্মসূচি অনুমােদনের পাশাপাশি বাস্তবায়ন কমিটিকে পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দেবে জাতীয় কমিটি। অপরদিকে বাস্তবায়ন কমিটি সার্বিক পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন এবং জাতীয় কমিটির অনুমােদন নিয়ে তা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে। সরকারিভাবে এই আয়ােজনে সকল বয়স ও শ্রেণিপেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। দেশের সর্বত্র এর বিস্তৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য শিশু, তরুণ, যুবক সকলের জন্য আলাদা আলাদা কর্মসূচির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বছরব্যাপী এই কর্মসূচিতে সরকারের সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তারা এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকাশনা, সভা, সেমিনার, কনসার্ট ইত্যাদির আয়ােজন করবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে মুজিব বর্ষ’ পালনের কর্মসূচি নিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এটিকে সর্বজনীন করে তুলতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

উপসংহার:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান না থাকলে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশই পেতাম না। তার দৃঢ় নেতৃত্বই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল অনুপ্রেরণা। তিনিই বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন । তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ তথা মুজিব বর্ষ বাঙালির কাছে এক
মহােৎসবের নাম।